সারাজীবন সিএনজি চালিয়ে ছেলেকে ক্রিকেটার বানিয়েছেন বিপ্লবের বাবা

ক্রিকেটভক্ত আবদুল কুদ্দুস ছোট ছেলের নাম রাখলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুলের খেলা খুব পছন্দ ছিল তার।

পরে ছেলের এই নামের সঙ্গে জুড়ে যায় বিপ্লব। এখন সবাই লেগস্পিন অলরাউন্ডার বিপ্লব নামেই চেনে। বিপ্লবের ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়তেও রীতিমত বিপ্লব করতে হয়েছে জীবনের সঙ্গে। বাবা আবদুল কুদ্দুস পেশায় সিএনজি অটোরিকশাচালক।

রাতদিন সিএনজি অটোরিকশা চালিয়েই ছেলের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে বিপ্লবের অভিষেক ঘটেছে অনেকদিন আগেই।
কিছুদিন দলের বাইরে ছিলেন।

এবার জিম্বাবুয়ে সফরে টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে রয়েছেন আমিনুল। তবে সফরে কোনো ম্যাচ না খেলেই ফিরতে হচ্ছে তাকে। তার ক্রিকেটভক্ত প্রিয় বাবা ইন্তেকাল করেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন আবদুল কুদ্দুস। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে কম কষ্ট করতে হয়নি আবদুল কুদ্দুসের।

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে ৫ সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। সিএনজি চালিয়ে সংসারের ভরনপোষণই দায়, সেখানে ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন বিলাসিতা।

পাড়ার লোকজনের মুখেও কম কথা শুনেননি আবদুল কুদ্দুস।বেশ কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন সে কথা।

আবদুল কুদ্দুস বলেছিলেন, আমার বন্ধুরা বলতো ছেলে দুটারে পড়ালেখা করায় কি হবে? গাড়ি চালানো শেখা। দিনে ২ হাজার টাকা আয় করব। আমি বলছি তোমাদের হিসাব তোমাদের কাছে। আমি বিপ্লবকে ক্রিকেটার বানিয়েছি।

সিএনজি চালিয়ে সংসারের পাশাপাশি ছেলের ক্রিকেটের পেছনে অর্থ ব্যয় করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তখন স্ত্রী ঘরের কাজ শেষে করে কুটিরশিল্পের নানা জিনিস বানিয়ে বিক্রি করে সহযোগিতা করেছে। এরপরও আমি এখনও আড়াই লাখ টাকা ঋণে ডুবে আছি।

আমিনুল ইসলাম বুলবুল কি করে বিপ্লব হলেন সে ইতিহাস বলতে গিয়ে আবদুল কুদ্দুস জানান, বিপ্লব নামটি দিয়েছেন ক্রিকেটার আশরাফুলের গুরু ওয়াহিদ গনি। তিনি জানালেন, বুলবুল নাম দিলে হবে না। তখন তাকে ছোট বুলবুল বলবে সবাই। ওর আলাদা পরিচয়-নাম দরকার। তখন তিনিই নাম দেন বিপ্লব।

এক সাক্ষাতকারে বিপ্লব জানিয়েছিলেন তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প।তিনি বলেছিলেন, ছোটবেলায় আমাকে বাবা ওয়াহিদুল গনি স্যারের একাডেমিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । সিএনজি চালিয়েই আমার কোচিংয়ের খরচ জোগাতেন বাবা।

মোহাম্মদ আশরাফুলের কোচের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালে পল্লীমা ক্রিকেট একাডেমিতে ক্রিকেট দীক্ষা নেওয়া শুরু হয় আমার। ২০১২ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা। ধীরে ধীরে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ধাপ পেরিয়ে সুযোগ পাই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে।

আশরাফুলের কোচ ওয়াহিদ গনির সঙ্গে কিভাবে সাক্ষাত হলো সে বিষয়ে বিপ্লব জানান, ২০০৮ সালে তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একটি টুর্নামেন্টে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। ম্যাচে একজনের অনুপস্থিতির কারণে আমাকে নেওয়া হয়। ওই ম্যাচে আমার খেলা খুব পছন্দ করেন ওয়াহিদ স্যার। এরপর তার পল্লীমা ক্রিকেট একাডেমিতে অনুশীলন শুরু করি।

মূলত বাবার নিরলস শ্রম আর অনুপ্রেরণাতেই ক্রিকেটার হতে পেরেছেন বিপ্লব। জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন।বাবা বেঁচে থাকাকালীন সেই সাক্ষাতকারে বিপ্লব বলেন, আমার সবচেয়ে বড় সুবিধা, বাবা ক্রিকেট বেশ ভালো বোঝেন। মাঝে কিছুদিন রান করতে পারছিলাম না।

তখন বাবা আমাকে বোঝাতেন, পরিশ্রমের পাশাপাশি ধৈর্য ধরতে বলতেন। আমার আব্বু রিয়াদ ভাইয়ের (মাহমুদউল্লাহ) খেলা খুব পছন্দ করেন। তিনি সব সময় বলেন, একজন ব্যাটসম্যানকে সব ধরনের শট খেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সিএনজি অটোরিকশাচালিয়ে তিল তিল শ্রম দিয়ে ছেলেকে ঠিকই ক্রিকেটার বানালেন। স্বপ্ন পূরণের পথের শুরুটা দেখেও গেলেন। কিন্তু বেশিদিন পারেননি। হৃদরোগে ভুগে অনেক আগেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

২১ বছর বয়সি লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব বাংলাদেশের পক্ষে ৭ টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। ১৭.৬০ গড়ে উইকেট পেয়েছেন ১০ টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.