তুখোড় মেধাবী ‘ডানাকাটা পরীকে’ নিয়ে এখনো গর্ববোধ করেন শিক্ষকরা (ভিডিও)

মা’দক মা’মলায় গ্রে’ফতার হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। ঢাকাসহ সারা দেশে চলছে তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। তবে এই নায়িকার গ্রামে তার সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক খবর পাওয়া যায়নি। তুখোড় মেধাবী হওয়ায় ‘ডানাকা’টা পরী’কে নিয়ে এখনো গর্ববোধ করেন তার স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা।

খুব ছোট বেলায় মাকে হা’রানো পরীমণি বড় হয়েছেন নানা বাড়িতে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পিরোজপুর জে’লার ভান্ডারিয়া উপজে’লার সিংহখালী গ্রামের নানা বাড়িতেই। এই সিংহখালী গ্রামকেই পরীমণির নিজের গ্রাম ধরে নেওয়া হয়। তার দাদার বাড়ি নড়াইল জে’লার লোহাগড়া উপজে’লায়। সেখানে কখনোই থাকেননি পরীমণি।

র‌্যা’বের হাতে আ’টকের পর সারা দেশের মতো তার গ্রামের বাড়িতেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অবশ্য এলাকাবাসী অনেকে তাকে পরীমণি নয় চেনেন স্মৃ’তি নামেই। ফলে ‘পরীমণির বাড়ি কোন দিকে’- প্রশ্ন করা হলে পাল্টা প্রশ্ন করেন অনেকে, ‘গাজী বাড়ির স্মৃ’তির কথা বলছেন’?

ভান্ডারিয়া উপজে’লার শেষ গ্রাম সিংহখালী, তার পাশেই মঠবাড়িয়া উপজে’লার ছোটশৌলা গ্রাম। সেখানে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিগ্রি কলেজ। পরীমণি এখানে পড়াশোনা করেন। কলেজের ভর্তির রেজিস্ট্রারের তথ্য অনুসারে, ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শামসুন্নাহার স্মৃ’তি।

কলেজটির অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, পরীমণির নানা সিংহখালী গ্রামের শামসুল হক গাজী। তিনি ভগীরথপুর স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আমি নিজেও তার ছাত্র ছিলাম।

তিনি জানান, ভগীরথপুর পুলিশ ক্যাম্পে কনস্টেবল পদে চাকরি করতেন পরীমণির বাবা নড়াইল জে’লার লোহাগড়া উপজে’লার মনিরুল ইসলাম। শামসুল হক গাজী স্যার তার সঙ্গে মেয়ে সালমা সুলতানার বিয়ে দেন। সালমা-মনিরের স’ন্তান শামসুন্নাহার স্মৃ’তি, যাকে এখন সবাই পরীমণি নামে চেনেন।

পরীমণির মায়ের মৃ’ত্যু আ’গুনে পু’ড়ে, বাবাকে করা হয় খু’ন
দক্ষিণ সিংহখালী স’রকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলায়েত হোসেন জানান, ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকের কথা। তখন স্মৃ’তির বয়স মাত্র তিন বছর।

তার বাবা মনিরুলের তখন ঢাকায় পোস্টিং। সেখানে একটি বাসায় আ’গুনে পু’ড়ে গু’রুতর দ’গ্ধ হন স্মৃ’তির মা সালমা। ঢাকায় কিছুদিন চিকিৎসার পর তাকে বাবা শামসুল হক গাজীর কাছে রেখে যান মনিরুল। এর দুই মাস পর মা’রা যান সালমা।

এরপর থেকে স্মৃ’তিকে তার নানা-নানি ও খালারা লালন-পালন করেন। স্মৃ’তির নানি মরহুমা ফাতিমা বেগম দক্ষিণ সিংহখালী স’রকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি মা’রা যাওয়ার পর আমি প্রধান শিক্ষক হই।

স্মৃ’তি ওরফে পরীমণি সর্ম্পকে তিনি বলেন, ছোট থেকে স্মৃ’তি ভালো ছাত্রী ছিল। তার নীতি-নৈতিকতাও ভালো ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে স্কুল থেকে একমাত্র সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এখন পর্যন্ত এই স্কুল থেকে আর কেউ বৃত্তি পায়নি। দেখতে খুব সুন্দর ছিল স্মৃ’তি। মা হা’রানো এতিম শি’শুটিকে এলাকার সবাই অনেক আদর করত।

পরিমণির ছোট খালা তাসলিমা পাপিয়া বলেন, ২০১২ সালে খু’ন হন স্মৃ’তির বাবা পুলিশ কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম। কোনো একটা কারণে তার চাকরি চলে গিয়েছিল। তখন তিনি গ্রামের বাড়িতে থেকে ব্যবসা করতেন। আমরা শুনেছি, সেই ব্যবসার বি’রোধ নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে কু’পিয়ে হ’’ত্যা করে।

কলেজে ভর্তি হয়ে হা’রিয়ে যান স্মৃ’তি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ভগীরথপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.৫ পেয়ে স্মৃ’তি ২০১১-২০১২ শিক্ষার্ষে আমার কলেজের মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর সে আর কলেজে আসেনি। অন্য কোথাও ভর্তি হতে হলে মার্কশিট নিতে হয়, তাও নেয়নি। এখনো আমার কলেজে তার মার্কশিট রয়ে গেছে। এরপর স্মৃ’তি কোথায় লেখাপড়া করেছে তা আমি জানি না।

তিনি বলেন, এসএসসি পাসের আগেই ২০১০ সালের দিকে স্মৃ’তিকে তার নানা গাজী স্যার ছোটশৌলা গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ইসমাইলের সঙ্গে বিয়ে দেন। জাকির হোসেন ভোলায় বসবাস করেন। তিনি জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন। ২ বছর পরই স্মৃ’তির সঙ্গে ইসমাইলের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

জাহাঙ্গীর কবির বলেন, স্মৃ’তি বাংলাদেশের একজন বড় নায়িকা হয়ে সুনাম অর্জন করেছে, বি’ষয়টি আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের কলেজের ছাত্রী হিসেবে আমরা গর্বিত। আজ (বৃহস্পতিবার) শুনলাম স্মৃ’তি র‌্যা’বের হাতে আ’টক হয়েছে। কী কারণে গ্রে’ফতার হয়েছে আর কাদের অ’ভিযোগে গ্রে’ফতার হয়েছে তা আমাদের জানা নেই।

সিংহখালী ও ছোটশৌলা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ব্যাংকার জাকির হোসেনের ছেলে ইসমাইল তখন বেকার ছিলেন। মোটরসাইকেল কেনার জন্য কিছু টাকা চেয়েছিলেন নানা শ্বশুর গাজী স্যারের কাছে। টাকা দিতে না পারায় ইসমাইল ও স্মৃ’তির সংসারে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এরপর স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদ হয়।

এ বি’ষয়ে এখন আর কোনো কথা বলতে রাজি নন পরীমণির সাবেক স্বামী ইসমাইল হোসেন। পরে আরেক বিয়ে করে এখন এক স’ন্তানের বাবা ইসমাইল। এলাকায় থাকলেও সংবাদকর্মীরা ফোন দিলে জানান, তিনি ভোলায় আছেন।

পরে ভগীরথপুর বাজারের কয়েকজন দোকানদারের মাধ্যমে ইসমাইল গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে বিচ্ছেদ হওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমরা কেউ কারো সম্পর্কে কোনো কথা বলিনি, এখনো বলব না।’

এলাকায় কোনো ‘অ’পকর্ম’ নেই পরীমণির
৯ নং ওয়ার্ড সিংহখালী গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, মা’দকসহ গ্রে’ফতার হয়েছে স্মৃ’তি, ঠিক আছে, তবে যেসব অ’ভিযোগ দেওয়া হচ্ছে তা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। এখানে যতদিন থেকেছে সে কোনো খা’রাপ কাজ-কর্মের সঙ্গে জ’ড়িত ছিল না। ভালো মেয়ে ছিল। গ্রামে তার কোনো অ’পকর্ম নেই।

পরীমণির খালু জসিম উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ ছিল স্মৃ’তির। আমরা তাকে কখনো বা’ধা দিইনি। মা-বাবা হা’রানো স্মৃ’তি যেন ভালো থাকে আমরা সবাই সেটাই চাইতাম। স্মৃ’তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অভিনয়ে, নাচে প্রথম স্থান অধিকার করত। উপজে’লা ও জে’লা পর্যায় থেকেও অনেক পুরস্কার অর্জন করেছে সে।

গ্রে’ফতারের বি’ষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না এবং কখনো করব না। কারণ নায়িকা হওয়ার পরে আমরা ঢাকায় তার বাসায় গিয়েছি। সে বাড়িতে আসত। কখনো তার এমন কোনো আচরণ চোখে পড়েনি। আমার বিশ্বাস, স্মৃ’তি ষ’ড়যন্ত্রের শি’কার হয়েছে।

দুই কারণে নাখোশ গ্রামবাসী
এলাকাবাসী সবাই পরীমণিকে ভালোবাসেন তেমন নয়, তার ও’পর খুশি নন এমনও অনেকে আছেন। তাদের বক্তব্য, বড় নায়িকা হওয়ার পরে নিজেকে অহংকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন পরীমণি। ২০২০ সালে সিংহখালী গ্রামে পরীমণির বেড়াতে আসার খবর পেয়ে তার নিজের কলেজের কিছু ছাত্রী দেখা করতে এসেছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা করেননি পরীমণি।

তাদের আরেকটি অ’ভিযোগ- বড় নায়িকা হওয়ার পরে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় এফডিসিতে ৫-৬টি পশু কোরবানি করলেও গ্রামবাসীকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো কোরবানি দেননি পরীমণি! তিনি নিজের গ্রামের মানুষদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন বলে জানান তারা।

হঠাৎ কোটিপতি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
পরীমণির নানা শামসুল হক গাজীর সাবেক এক সহকর্মী জানান, শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেলেও পেনশনের টাকা তুলতে পারেননি গাজী স্যার। তিনি অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় দিনাতিপাত করেছেন। স্মৃ’তি ছোটবেলা থেকে নানার সংসারে অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। ভান্ডারিয়া উপজে’লার এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর হাত ধরে ঢাকায় পাড়ি দেওয়ার পর ২০১৫ সালে নাম লেখান চলচ্চিত্রে। এরপরই হঠাৎ বিলাসী জীবন শুরু হয় স্মৃ’তির।

ঢাকায় তার ফ্ল্যাট আছে, গাড়ি আছে। নানাকে গ্রামে একতলা বাড়ি করে দিয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এত দ্রুত কোটিপতি হওয়ার বি’ষয়টি স’ন্দেহজনক। পরীমণির নানা মাসের অর্ধেক সময় ঢাকায় তার কাছে এবং বাকি অর্ধেক সময় বাড়িতে থাকেন। তবে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের ধ”ণচেষ্টার শি’কার হওয়ার পর থেকে তিনি ঢাকাতেই থাকছেন। সর্বশেষ র‌্যা’বের অ’ভিযানে পরীমণি গ্রে’ফতারের ঘটনার দিনও তিনি ঢাকায় ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বুধবার (০৪ আগস্ট) রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অ’ভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমণিকে আ’টক করে র‌্যা’ব। এ সময় তার বাসা থেকে ২ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকার মা’দকদ্রব্য উ’দ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বনানী থানায় দা’য়ের করা মা’দক আইনের মা’মলায় পরীমণির চার দিনের রি’মান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যা’জিস্ট্রেট মামুনুর রশিদের আ’দালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.