যেভাবে মায়ের ৩৭ বছরের আক্ষেপ মেটালেন ‘ছেলে’

১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের কথা উঠলেই আক্ষেপে ভেসে চান পিটি ঊষা। সেবার যে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ব্যবধানে পদক হাতছাড়া করেন তিনি।

তবে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে ভারতকে প্রথম সোনা এনে দিয়েছেন নীরাজ চোপড়া। আনন্দে এই থ্রোয়ারকে নিজের ছেলে বলে উচ্ছ্বাসে মেতেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ছেলের হাত ধরেই মিটেছে তার ৩৭ বছরের আক্ষেপ।

পিটি ঊষাকে বলা হয় ‘কুইন অফ ইন্ডিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড’। এর আগে গত ২৬ জুলাই ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিটি ঊষা জানিয়েছিলেন যে, নীরাজ পদক নিয়েই ভারতে ফিরবেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ধারাবাহিকতার বিচারে নীরাজ চোপড়া এক নম্বর। টোকিওতে তার পদক জয়ের সম্ভাবনা আছে।

শুধু পদক নয়, জ্যাভেলিন থ্রো থেকে সোনা জিতেছেন নীরাজ। এতে আনন্দে ভেসে যাচ্ছেন ঊষা। তার এই সাফল্যকে নিজের ছেলের সাফল্য হিসেবেই মনে করছেন তিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারকে তিনি বলেন, মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে পদক, তাও আবার সোনা! সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না। কয়জন আর ভাবতে পেরেছিলেন, টোকিওতে আমাদের শেষটা এভাবে হবে!

তিনি আরো বলেন, অ্যাথলেটিক্সে অন্তত একটা পদকের স্বপ্ন তো বহু যুগ ধরেই আমরা দেখে আসছিলাম। একটা সময় বোধহয় সেই স্বপ্নের কথা ভুলেও গেলাম। অনন্ত কালেও অপেক্ষা যদি শেষ না হয়, তাহলে তো এরকমই হবে! তার ওপর আমি নিজে একেবারে আক্ষরিক অর্থে ভুক্তভোগী। একবার তো আমারই মুঠো থেকে ছিটকে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল সেই স্বপ্নটা।

সেই ঘটনা জানাতে গিয়ে ঊষা বলেন, হ্যাঁ আমি চুরাশির লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের কথা বলছি। তার আগে মস্কোতেও গিয়েছি অ্যাথলেটিক্স থেকে পদক আনতে। কিন্তু রাশিয়ায় পারিনি। চার বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রেও পারলাম না। এবার মেয়েদের চারশ মিটার হার্ডলসে ব্রোঞ্জের থেকে আমি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পিছিয়ে থাকলাম। সেই আফসোস শেষ ৩৭ বছর ধরে মনের ভিতরে ঝড় তুলেছে। যত বার ভাবতে বসেছি, বিশ্বাস করুন তত বার কান্না পেয়েছে।

এই দৌড়বিদ যোগ করেন, শুধু তো আমি না! আমার অনেক আগে ‘উড়ন্ত শিখ’ মিলখা সিংও প্রায় স্বপ্নের তীরে পৌঁছে শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তাই মিলখাজির কষ্টটা অনুভব করতাম। উনিও আমার মতোই রোম অলিম্পিক্সে ০.১ সেকেন্ডের জন্য চতুর্থ হয়ে যান। সে বার ৪০০ মিটারে ব্রোঞ্জজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিন্টার সময় নিয়েছিলেন ৪৫.৫ সেকেন্ড। মিলখা সেখানে দৌড়ন ৪৫.৬ সেকেন্ডে। ভাবুন, এ রকম ঘটলে এক জন অ্যাথ‌লেটের মনের অবস্থাটা কী হয়!

কিছুদিন আগেই মারা গেছেন মিলখা সিং। সেজন্য আফসোস করে ঊষা বলেন, কে না জানে, সব খেলার জননী হচ্ছে অ্যাথলেটিক্স। সেখানে একটা পদক যে কতটা মহার্ঘ্য, তা বলে বোঝানো যায় না। আমি তো তবু দেখতে পেলাম হরিয়ানার তরুণ তুর্কি অ্যাথলেটের অতুলনীয় জ্যাভেলিন ছোড়া। কিন্তু খারাপ লাগছে, মিলখাজি দেখতে পেলেন না। তিনি তো কবে থেকেই এই মুহূর্তটার জন্য দিন গুনেছেন। আন্দাজ করতে পারছি, আজ উনি বেঁচে থাকলে ঠিক কতটা খুশি হতেন। দূর্ভাগ্য ইতিহাস সৃষ্টির মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি চলে গেলেন।

দলবল নিয়েই নীরাজের খেলা উপভোগ করেছেন জানিয়ে সাবেক দৌড়বিদ বলেন, সবাই জানে কেরালায় আমরা অলিম্পিকের ট্র্যাক ইভেন্ট দেখার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকি। আমাদের এখানে এই ইভেন্ট অসম্ভব জনপ্রিয়। তাই অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে স্বপ্নের সোনার জন্য আমাদের আকুতিটা বোধহয় চিরকালই একটু বেশি। এজন্য খোঁজখবরও রাখার চেষ্টা করি সবসময়। টোকিওতে রওনা হওয়ার আগে থেকেই আমাদের মনে নীরাজকে নিয়ে বিরাট আশা ছিল। মনে হয়েছিল, ছেলেটা পারলেও পারতে পারে। তাই শনিবার আমরা সবাই মিলে দল বেঁধে ওর জ্যাভেলিন ছোঁড়া দেখতে বসেছিলাম। তার আগে যোগ্যতা অর্জনের লড়াইটাও একই ভাবে দেখেছি। যেখানে মাত্র একটা ছোঁড়াতেই ও সেরা হয়ে গেল। সেটাও কম বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না।

তিনি আরো বলেন, জানতাম নীরজের সোনা জেতার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ভয়টা ছিল জার্মানির ইয়োহানেস ফেইটাকে নিয়ে। ও যে বিশ্বের অন্যতম সেরা! কিন্তু প্রায় নিয়ম করে ফাইনালে আমাদের ছেলেটা ৮৫ মিটারের উপরে ছুঁড়ে গেল। যা সত্যি ভাবা যায় না। মুগ্ধ করল ওর ধারাবাহিকতাও। ফাইনালেও নীরাজের আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছিল। এই আত্মবিশ্বাসটা ধরা যায় একজন অ্যাথলেটের হাঁটাচলা সবকিছুর মধ্যেও। আমি নিজে তো সেটা দিব্যি বুঝতে পারি। নীরাজকে দেখে যেটা বারবারই মনে হচ্ছিল।

এরপর ঊষা যোগ করেন, আমি কিন্তু নীরাজকে পোল্যান্ডে ও বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতার সময় থেকেই চিনি। কতই বা বয়স তখন! আমি ওখানে গিয়েছিলাম কয়েক জন স্প্রিন্টারের কোচ হয়ে। তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম, ছেলেটা নিজের ইভেন্টে কতটা মনঃসংযোগ করে! অন্য আর কিছুতেই যেন আগ্রহ নেই। আরো দেখতাম, বাজে সময় নষ্ট করাটা ছেলেটার ধাতেই নেই। ঠিকঠাক অনুশীলন করে। যেটুকু বিশ্রাম নেয়ার দরকার, নিচ্ছে। কোচদের সঙ্গে আলোচনা করছে। অন্য অ্যাথলেটদের সঙ্গে কথা বলেও যেন অনেক কিছু শিখতে চাইছে। বেশির ভাগ সময়টাই দেখতাম, জ্যাভেলিন নিয়ে পড়ে আছে। সেজন্য একের পর এক ভিডিও পর্যন্ত দেখে যাচ্ছে।

পরিশেষে ভারতীয় এই কিংবদন্তি বলেন, নীরাজ এমনিতে কিন্তু একেবারে সহজ-সরল ছেলে। যে কেউ ইচ্ছে করলে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারে। সঙ্গে বড়দের সম্মান দিতেও জানে। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। দেখলেই যে কারো ভাল লাগবে। কমবয়সীরা তো এ রকমই হবে! এমনিতে নীরাজের উঠে আসার অনেক কারণ আছে। তার একটা অবশ্যই বড় বড় প্রতিযোগিতায় নামতে পারার সুযোগ পাওয়াটা। তার উপরে ইউরোপেও প্রস্তুতি নিয়েছে। ওর কয়েক জন কোচ তো জার্মানির! যারা আবার একসময়ের জ্যাভেলিনের বড় বড় তারকা। আমি বলব ওর এই সোনা জেতাটা বেশি কৃতিত্বের কারণ নীরাজ সদ্য চোট সারিয়ে উঠেছে। এই ছেলেটা যে সত্যি সত্যিই স্বপ্ন সত্যি করল। এখনও যা বিশ্বাস হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *