এসব করেছি একমাত্র টিকে থাকার জন্য : পূর্ণিমা

ঈদ উপলক্ষে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমি চট্টগ্রামের মেয়ে, সময়–সুযোগ পেলেই যাওয়া–আসার মধ্যে থাকি।১৫ মে ১৯৯৮ মুক্তি পেয়েছিল আপনার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘এ জীবন তোমার আমার’। গত সপ্তাহে সেই ছবি মুক্তির ২৪ বছর। আপনার অভিনয়জীবনেরও।

পেছন ফিরে তাকালে কোন স্মৃতি সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়? এত লম্বা সময় কখন যে পেরিয়ে এসেছি, টেরই পাইনি। তবে আমার প্রাপ্তি অনেক। এখনকার দিনের সঙ্গে তুলনা করলে এ-ও মনে হয়, আমি খুবই ভাগ্যবান। সবার ভালোবাসায় থাকা, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অনেক বড় ব্যাপার।

যখন সেসব প্রাপ্তির কথা ভাবি, এই দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি মুছে যায়। গর্বিতও হই, নিজেকে সন্তুষ্টচিত্তে মনে হয় এখনো অনেক ভালো অবস্থানে আছি। আমার সময়ে অনেকে এসেছিলেন, হারিয়েও গেছেন। আমিও মাঝে চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু আবারও কোনো না কোনোভাবে ফিরে এসে নিজের অবস্থান শক্ত করেছি।

সবকিছু মিলিয়ে যেতে হয়েছিল। চলচ্চিত্রে যখন দুঃসময় এল, তখন ভেবেছিলাম, এই বুঝি শেষ! আর বুঝি ছবিতে অভিনয় করা হবে না। অশ্লীল ছবি নির্মাণের হিড়িক পড়ে গেল। কিন্তু আমি তো আর অশ্লীল ছবিতে অভিনয় করব না। স্রোতে গা ভাসাব না। আবার যখন ভালো ছবির জোয়ার এল, অভিনয় শুরু করলাম।

মান্না ভাই ও রিয়াজের সঙ্গে নতুন করে জুটি বাঁধলাম। যখন অন্য জুটি হিট হতে শুরু করল, আমাদের নিয়ে তখন আবার কাজ করা কমে গেল। তখন আবার টেলিভিশন বা অন্য অঙ্গনে কাজ শুরু করলাম। এরপর তো বিয়ে করলাম, সংসার শুরু হলো—ভাবলাম এবার বুঝি ক্যারিয়ার শেষ।

আশপাশের সবাই বলতেন, সাংবাদিকেরা বলতেন, বিয়ে করলেই নাকি ক্যারিয়ার শেষ। বিয়েশাদি শেষে ঘরসংসার করে, সন্তান লালন–পালন করব। এরপরও সংসারের সবকিছু সমন্বয় করে কিন্তু আমি একটানা কাজ করে গেছি। মান্না ভাই,

শাকিব ও রিয়াজের সঙ্গে অনেকগুলো ছবি করলাম। এর মধ্যে মা হলাম। এবার কনফার্ম ছিলাম, এবার আমি পুরোপুরি শেষ! আমার আর কাজ করা হবে না। এরপর আবার নাটক দিয়ে অভিনয় শুরু করি। এরপর মেরিল-প্রথম অনুষ্ঠানে

নোবেল ভাইয়ের একটি গানের পরিবেশনা পছন্দ করলেন সবাই। আবার ব্যস্ত হতে শুরু করলাম। একটা সময় মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে যেন আমার নতুন জন্ম হলো।

সিনেমার ফাঁকে ফাঁকে টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করতেন আপনি। সিনেমার শিল্পী হয়ে কেন নাটক করতেন? আমার অভিনয়জীবন শুরু হয় টেলিভিশন থেকেই। প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সময়ই আমি নাটকে অভিনয় করি,

রেজানুর রহমান পরিচালিত সেই নাটকে আমি ছিলাম শহীদুজ্জামান সেলিমের সহশিল্পী। সুভাষ দত্ত পরিচালিত আমার দ্বিতীয় নাটকের সহশিল্পী ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। সিনেমায় অভিনয় করলেও সব সময় ঈদের নাটক করতাম।

আমার কাছে ছোট পর্দা–বড় পর্দা কোনো ব্যাপার ছিল না। শিল্পমাধ্যমে কাজ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। কাজের জায়গায় তৃপ্তি পাওয়াটাই ছিল বড় বিষয়। নাটকে অভিনয় কখনই ব্যাকআপ প্ল্যান ছিল না।

মা সব সময় চেয়েছিলেন আমাকে গানের শিল্পী বানাবেন। রাজু ভাই (জাকির হোসেন রাজু) প্রথম নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তখন সায়েন্স ল্যাবরেটরি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। শুরু করলাম। একপর্যায়ে মনে হলো সিনেমায় অভিনয় ছাড়া আমার কোনো গতি নেই।

এটাই আমার পেশা, নিজেকে বিকশিত করার একমাত্র উপায়। তবে কখন এর প্রতি ভালোবাসা তৈরি হলো, নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। এ রকম মনে হওয়ার কারণ কী? এই কাজ ছাড়া কোনো চাকরি করব, সেই সুযোগও তো ছিল না। কারণ, কোনো চাকরির জন্য যে কোয়ালিফিকেশন দরকার, তা আমার নেই।

তাহলে আমার কাজটা কী হবে? আমার কাজ হচ্ছে অভিনয় করা। যেখানে ঢুকে পড়লাম, সেখান থেকে আর বের হতে পারব না। তবে কখনো ভেবেছি, এই বুঝি শেষ। এরপর সেখান থেকে আবার ঘুরেও দাঁড়িয়েছি। এমন কোনো চরিত্রকে মনে মনে লালন করছেন, যা এখনো করা হয়ে ওঠেনি?

নারীপ্রধান গল্পে কাজ করতে চাই। বিদ্যা বালানের ‘কাহানি’ ছবিটা দেখে মনে হয়েছে, এ ধরনের গল্পে যদি কাজ করতে পারতাম। বিদেশি কিছু ছবি দেখে মনে হয় ফিগার, বেশি ওজন, বয়সের ছাপ—এসব কিছু না। সেখানে অভিনয়টাই মুখ্য।

অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে একটা কথা প্রায়ই শুনি, গল্প ও পরিচালক পছন্দ হওয়ায় তিনি ছবিটিতে যুক্ত হন। আপনার কাছে জানতে চাই, এত দিন যত ছবিতে অভিনয় করেছেন, সব কি পছন্দে করেছেন নাকি অন্য কোনো কারণও ছিল?

এখন পর্যন্ত আমার অভিনীত ৮০টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। সব ছবিতে অভিনয় নিজের পছন্দে করিনি। কিছু ছবির কাজ বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। প্রথম দিকে ওই ছবিগুলোতে কাজ না করলে চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে হারিয়ে যেতাম। আমি টিকে থাকার জন্য এসব করেছি। একরকম ‘আওয়াজে থাকা’ও বলতে পারেন। প্রতিদিন এফডিসিতে ঢুকছি, কোনো না কোনো ছবিতে কাজ করছি—সবাইকে এটা দেখাতে হয়েছে। কিছু চলচ্চিত্রে আবার চরিত্রের লোভে কাজ করেছি, কিন্তু ওসব ছবিতে অভিনয়ের জন্য যথাযথ সম্মানী পাইনি।

ওসব ছবিতে অভিনয় নিয়ে আফসোস হয়? ফেলে আসা সময় নিয়ে আমি মোটেও ভাবি না। তবে ওই ছবিগুলোতে কেন অভিনয় করেছিলাম, ভাবলে হাসি পায়। মনে হয়, ওই অভিজ্ঞতারও দরকার ছিল।

২৩ বছর অনেক নায়কের সঙ্গে অভিনয় করেছেন, কার সঙ্গে আপনার বোঝাপড়া সবচেয়ে চমৎকার ছিল? মান্না ভাই। তিনি আমাকে বুঝতে পারতেন। বয়সে বড় হলেও ভীষণ বন্ধুবৎসল ছিলেন। পূর্ণিমাপূর্ণিমা সমসাময়িক বা আপনার আগে ও পরে যে অভিনেত্রীরা, তাঁদের মধ্যে কাউকে নিয়ে কি ঈর্ষা হয়েছে একজন নায়িকাই ছিল, যাকে খুব ঈর্ষা হতো। কে তিনি?

তাঁর নাম বলা যাবে না। আমার মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ঈর্ষাটা তৈরি করা হয়েছিল। পরিচালকেরা তাঁর সঙ্গে তুলনা করতেন আমাকে। কিন্তু তিনি তো সুপারস্টার, তাঁর সঙ্গে আমাকে তুলনা করাটাই ছিল ভুল। তাঁদের কারণেই সেই নায়িকার প্রতি ঈর্ষা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটা তো ঠিক যে আমি কোনো দিন তাঁর মতো হতে পারব না, তিনিও আমার মতো নন। সবাই চাইত, তাঁর মতো এক্সপ্রেশন দিতে। এসবে আমার খুব কান্না পেত। মেকআপ রুমে গিয়ে চোখের পানি মুছে আবার শট দিতাম।

ফেরদৌস ও পূর্ণিমাফেরদৌস ও পূর্ণিমা এখন নিয়মিত উপস্থাপনা করছেন। এ কৌশল হঠাৎ রপ্ত করলেন কীভাবে? এটা রপ্ত করার কিছু নয়, আমার ভেতর থেকে যা আসে, সেটাই করি। আর স্ক্রিপ্ট থাকলে সেখান থেকে কিছু কিছু জায়গায় ইম্প্রোভাইজ করার চেষ্টা করি। উপস্থাপনায় আপনি কি কাউকে অনুসরণ করেন বা কার উপস্থাপনা ভালো লাগে?

হানিফ সংকেত। তাঁর উপস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করে। কথা দিয়ে দর্শককে ধরে রাখার তাঁর যে মুনশিয়ানা, এটা আমাকে অবাক করে। আমার তো তাঁর সঙ্গে নামেও মিল আছে, তিনি হানিফ সংকেত আর আমি দিলারা হানিফ (হাসি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *