পদ্মায় দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ কম দূরত্বের টার্নিং পয়েন্ট

পদ্মা সেতুর পিলারে বারবার ফেরির ধাক্কা লাগার অন্যতম কারণ হিসেবে স্বল্প দূরত্বের টার্নিং পয়েন্টকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। পদ্মা নদীর তীব্র স্রোত, ফিটনেসবিহীন ফেরি কিংবা চালকদের অবহেলার পাশাপাশি কম দূরত্বের টার্নিং পয়েন্ট এ দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে মনে করছেন তারা।

সমস্যা সমাধানে এরই মধ্যে টার্নিং পয়েন্টের দূরত্ব দ্বিগুণ করা হয়েছে। কিন্তু এতেও সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা ঠেকানো যাবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই বলে দাবি করেছে ফেরি কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে টার্নিং পয়েন্টের দূরত্ব বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিসি)।

সংস্থাটির পরিচালক (বাণিজ্য) এবং ২৩ জুলাই পদ্মা সেতুর পিলারে রো রো ফেরি শাহজালালের ধাক্কা দেয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, পদ্মা সেতুর পিলারে কেন বারবার ফেরির ধাক্কা লাগছে এ বিষয়ে আমরা বিস্তর গবেষণা করেছি।

এতে দেখা গেছে, যে পয়েন্টে এসে ফেরি পদ্মা সেতুর পিলার পার হবে, সেতুর পিলার থেকে তার দূরত্ব দেড় কিলোমিটার। নদীতে যখন তীব্র স্রোত থাকে, তখন আট-নয় মিনিটের মধ্যেই ফেরি সেতুর পিলারের কাছাকাছি চলে আসে। এত কম সময়ে ফেরি নতুন মোড়ে ঘোরানো প্রায় অসম্ভব।

আমরা এ সময়টাকে বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য, কীভাবে চালক আরো ১০-১৫ মিনিট সময় বেশি নিয়ে ফেরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন সে সুযোগ তৈরি করা। তিনি জানান, এরই মধ্যে টার্নিং পয়েন্ট দ্বিগুণ বাড়িয়ে তিন কিলোমিটার করা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, বাংলাবাজার ঘাট থেকে বের হয়ে মূল পদ্মায় আসার আগেই মাগুরখণ্ড চ্যানেল থেকে ওপরের দিকে (স্রোতের অনুকূলে) তিন কিলোমিটার যাওয়া নিশ্চিত করতে চ্যানেলের শেষ মাথায় একটি বয়া (আধুনিক বাতিযুক্ত টার্নিং পয়েন্ট) বসানো হয়েছে।

ওপরের দিকে তিন কিলোমিটার গিয়ে এল আকৃতির রুটে ফিরে পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে শিমুলিয়া ঘাটের দিকে যাবে ফেরি। এছাড়া পদ্মা সেতুর মাওয়া ঘাটের দিকে সেনাবাহিনীর একটি টহল স্পিডবোট মোতায়েন করা হয়েছে। ফেরির গতিপথ বুঝে চালককে আগেই সতর্ক করবে তারা।

সেজন্য তাকে চ্যানেল থেকে বের হয়ে ব্রিজের দিকে না গিয়ে উল্টো দিকে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে একটা টার্গেট পয়েন্ট থেকে ঘুরতে হবে। টার্নিং পয়েন্টের দূরত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঠেকাতে ফেরি চলাচলের জন্য ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর পিলারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে ফেরির চালকদের মূলত ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের মাঝ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এসব উদ্যোগেও পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা ঠেকানো কোনো কোনো সময় সম্ভব নাও হতে পারে বলে মনে করছেন মাওয়া ফেরিঘাটের কর্মকর্তা ও মাস্টাররা।

এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো পদ্মার আচরণ বোঝা মুশকিল। টার্নিং পয়েন্টের দূরত্ব বাড়ানোর বিষয়টি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ মাত্র। এতে কাজ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিচালকরাও দাবি করছেন, বর্ষা মৌসুমে স্রোতের দুর্বোধ্য আচরণ ফেরিচালকদের বিভ্রান্ত করছে। তাদের ভাষ্যমতে, পদ্মার স্রোত সবসময় একই ধারায় বয়ে চলে না। কখনো সোজা, কখনো বাঁকা, আবার কখনো তীব্র ঘূর্ণিস্রোতও তৈরি হয়। এমন দুর্বোধ্য স্রোতধারার কারণে ফেরিচালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছেন।

চালকরা জানান, এ বছরই প্রথম মূল পদ্মা নদী হয়ে ফেরি চলাচল করছে। এর আগে নৌযান চলাচল করত লৌহজং রুটে। ওই রুটে চর পড়ে যাওয়ায় পদ্মা সেতুর প্রকৌশলীরা রুটটি বন্ধ করে দেন। বর্তমানে মাগুরখণ্ড রুটে ফেরি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা। স্রোতের তীব্রতায় দক্ষ মাস্টারদের পক্ষেও ফেরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না।

মাওয়া ঘাটের মাস্টাররা জানিয়েছেন, বর্তমানে পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা লাগার ঘটনা ঠেকাতে বেশ কড়া নজরদারি চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি ফেরি ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আকারে বিস্তারিত তথ্য দিতে হচ্ছে।

ফেরি ছাড়ার আগে কখন ছাড়বে, কোন কোন পিলারের পাশ দিয়ে যাবে, পৌঁছতে কত সময় লাগতে পারে ইত্যাদি তথ্য লিখে যাত্রা করতে হয়। এছাড়াও ফেরি নদীতে থাকা অবস্থায় কোন অবস্থানে আছে, সে তথ্যও একটু পরপর জানাতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *