ঢাকায় ছেলেরা নিজ ফ্ল্যাটে, বৃদ্ধ বাবা পেটের দায়ে রাস্তায়!

পৃথিবীতে যে দুইজন মানুষ বেশি আপনজন এবং বেশি ভালোবাসেন, মমতায় পরিপন্ন করে রাখেন তারা হলেন মা-বাবা।আমাদের বিপদাপদে ছায়ার মতো কাছে থাকেন তারা। নিজে খেয়ে না খেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা সন্তানকে বড় করেন।

কিন্তু সেই বাবা-মায়ের স্থান যদি না হয় উপযুক্ত সন্তানদের কাছে তাহলে এর চেয়ে কঠিন নির্মমতা আর কি হতে পারে। ঠিক এমনই এক অসহায় বাবা নওগাঁর ফুটপাতের দোকানি মো. সামছুল আলম (৭৫)।

পেটের তাগিতে দু’বেলা খাবারের জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে নওগাঁর আদালত প্রাঙ্গণে রাস্তার সামনে ফুটপাতে দোকান দিয়ে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সারাদিন বিক্রিত পণ্য থেকে যে টাকা লাভ হয় তা দিয়ে ওষুধ ও সাংসারিক খচর যোগাতে হিমসিম খেতে হয়।

যখন খুব অসুস্থবোধ করেন তখন রাস্তায় বসে পণ্যগুলো বিক্রি করতে না পারলে সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়। সেই ৯০ দশকের কথা চার সন্তানের জনক সামছুল আলম নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর থেকে পরিবারসহ নওগাঁতে এসে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সেসময় নওগাঁতে কাপড়ের ব্যবসা তেমন প্রসিদ্ধ ছিল না।

পৈত্তিক সম্পত্তি বিক্রি করে লাভের আশায় নওগাঁ শহরের কাপড় পট্টিতে দোকান ঘরের পজিশন কিনে শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি সামছুল আলম আলমের। ব্যবসার লাভের টাকা নিয়ে শহরের পান-নওগাঁতে জায়গা কিনে বাড়ি করেন তিনি।

এর পর ঢাকা শহরে দুই ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়ে দেয়। ব্যবসায় লাভের অংশ দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেন দুই ছেলে। নওগাঁতে দুই সন্তান ও শুরু করেন ভিন্নভাবে দোকান দিয়ে কাপড় ব্যবসা। ভালোই চলছিল সামছুল আলম এর ব্যবসা ও পরিবার নিয়ে সংসার জীবন।

২০০৪ সালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই জন কর্মচারী তার কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে সামছুল আলমের প্রস্রাব-জনিত সমস্যা কারণে দুটি অপারেশন করতে হয়। যার কারণে দোকানঘর ও বাঁকি কাপড়গুলো বিক্রি করে দিতে হয়। এর পর থেকে ব্যবসা ও সংসার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।

কথা হয় সামছুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, চার ছেলে সন্তানকে পড়াশোনা করিয়েছি তার সঙ্গে তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছি। দুই ছেলে নওগাঁতে আর দুই ছেলে ঢাকাতে ব্যবসা করে। যখন আমার নিজ হাতে দাঁড় করানো ব্যবসায় লস হতে লাগছিল তখন তাদের সহায়তা চেয়েছিলাম কিন্তু কোনও সন্তান এগিয়ে আসেনি।

এমনকি আমার অপারেশন করানোর সময় ও তারা আমার পাশে দাঁড়ায়নি। ভুল ছিল তাদের নামে সব কিছু করে দেয়া। আমার নিজ হাতে করা বাড়িতে ও স্থান হয়নি। বর্তমানে ছোট টিনশেড ঘর ভাড়া নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী কোন রকমে বসবাস করছি।

তিনি বলেন, অনেক আগেই নওগাঁতে এসেছি জীবনে উন্নতি করবো বলে, সেটাও করেছিলাম নিয়তির চরম লেখার কাছে হার মেনে আজ রাস্তার পাশে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে পেটের তাগিতে শীতকালীন সুরক্ষা সামগ্রীসহ কিছু পণ্য বিক্রি করি। সারাদিন বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মত লাভ থাকে কিন্তু দুইজন মানুষের ওষুধসহ সাংসারিক খরচ চালাতে কত যে কষ্ট হয় তা বোঝাতে পারবো না। তবুও যতদিন বেঁচে আছি কারো কাছে হাত পাতবো না।

কান্না বিজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, সেই ৯০ সালের দিকে নওগাঁতে এসেছি জীবন গড়ার তাগিতে। ভাই বোন আত্মীয়স্বজন সবাই জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে থাকে। সেই কবে শেষ বারের মতো গেছি সঠিক মনে নাই। বর্তমানে চার ছেলের স্ত্রী-সন্তান হয়েছে। তাদের ঘরেই যখন আমাদের মত বৃদ্ধ বাবা মা’র স্থান হয়নি তখন অর্থ দিয়ে দেখা শোনা করার মতো সময় বা ইচ্ছা তাদের নেই। কয়েকবার বলেছিলাম সন্তানদের যে আমরা দুই মা বাবা খুব অসুস্থ সন্তান হিসেবে তোমরা একটু পাশে দাঁড়াও কিন্তু তাদের ইচ্ছা বা সময় নেই।

সময়ের বিবর্তনে রাস্তায় নামতে হবে তা ভাবতে খুব অসহায় বোধ করি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন করুন পরিস্থিতি পড়তে হবে তা কখনো ভাবি নাই। তবুও দোয়া তারা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে সুখে থাকুক। ভালো থাকুক। কখনো অভিশাপ দিবো না। নিয়তি যেন কখনো তাদেরও জীবনের পড়ন্ত বেলায় অবহেলার পাত্র না করে তাদের সন্তানদের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *