১৮ বছর মাত্র ১ টাকা বেতনে পড়াচ্ছেন বর্ধমানের ‘ফকির মাস্টার’, পেলেন পদ্মশ্রী সম্মান

পড়াশোনা শেষ করেই শিক্ষাকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল সমাজ থেকে অশিক্ষার অন্ধকারে মুছে দেওয়া। চাকরিতে অবসর গ্রহণের পরও শিক্ষা বিতরনের জেদটা এখনও জিইয়ে রেখেছেন তিনি।

সেই কারণে আজ শিক্ষকতা করেন তিনি। তবে অন্যান্য শিক্ষকদের থেকে অনেকটাই আলাদা তিনি। মাত্র ১ টাকা বেতন নিয়ে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীদের আজ শিক্ষা দিয়ে চলেছেন তিনি।

সেই ফকির মাস্টার ওরোফে সদাই ফকিরকে কে পদ্মশ্রী (Padmashree) সম্মানে ভূষিত করা হলো। তার আসল নাম সুজিত চট্টোপাধ্যায়। তবে মানুষে তাকে ফকির মাস্টার নামে চেনে। তার বাস পূর্ব বর্ধমানের আউসগ্রামের উত্তর রামনগর গ্রামে।

রাম নগর জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ছোটবেলায় পড়াশোনা শেষ করে বোলপুরের বাধগড়া হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। রামনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই তার শিক্ষকতা শুরু।

পরবর্তীকালে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করার পরে মাস্টার্স করেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর জলপাইগু’ড়ি থেকেই বিটি পাস করেন তিনি।

মাধ্যমিক স্তরে বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে বাংলা পড়ান তিনি। স’ঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে সাহায্য করেন থ্যালাসেমিয়া আ’ক্রা’ন্তদের। বছরে এক বার থ্যালাসেমিয়া নির্ণায়ক শিবিরও করেন। মাস্টারমশাইয়ের নাম শুনলে জোড়হাত মাথায় ঠেকান আশপাশের বহু গ্রামের বাসিন্দা।

তাঁদের মধ্যে মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন রয়েছেন, রয়েছেন বহু অ’ভিভাবকও। ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে তাঁর কাছে এখনও পড়তে আসে অনেকে। ১৯৬৫ সালে বয়স তখন মাত্র ২২। তখন থেকেই চাকরি জীবনে প্রবেশ তার। সেই স্কুলের চাকরি থেকে ২০০৪ সালে অবসর নিলেও শিক্ষকতা ছাড়েননি তিনি।

স্কুলেরই একটা ঘরে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতে চাইলেও অনুমতি মেলেনি। পরবর্তীকালে এলাকার দুস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়িতেই প্রাইভেট টিউশনি পড়াতে শুরু করেন তিনি, পারিশ্রমিক বছরে ১ টাকা। দেখতে দেখতে তার বাড়ি হয়ে উঠল “সদাই ফকিরের পাঠশালা”।

এই সদাই ফকির এবার ভূষিত হলেন পদ্মশ্রী সম্মানে। ২০০৪ সালে স্কুল থেকে অবসর নিয়ে বাড়িতেই শুরু করেন পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের পড়ানো। পেনশনের টাকার একাংশ খরচ করে পড়ুয়াদের বই-খাতা কিনে দেন। প্রথম দিকে বিনা পারিশ্রমিকেই পড়াতেন। পড়ুয়াদের প্রণামই ছিল গু’রুদক্ষিণা।

পরে থ্যালাসেমিয়া আ’ক্রা’ন্তদের সাহায্যের জন্য বছরে এক টাকা ‘দক্ষিণা’ নেওয়া শুরু করেন। হাসিমুখে বৃ’দ্ধ শিক্ষক বলেন, ‘‘বাজার আগু’ন। এখন তাই দক্ষিণা বেড়ে হয়েছে দু’টাকা।’’ বছর খানেক আগে এক থ্যালাসেমিয়া আ’ক্রা’ন্ত ছাত্রের ক্যানসারও ধ’রা পড়েছে। প্রতি মাসে তার কলকাতা যাতায়াতের জন্যও সাহায্য করেন ‘মাস্টারমশাই’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.