মানুষের ধারণা পাল্টে দিতে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ১১৫ দেশ ভ্রমণ

একজন নারী হয়ে যেমন ছুটে চলেছেন বিশ্বের আনাচে-কানাচে, তেমনি এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেও কাজ করছেন। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

শুধু বিদেশে বাংলাদেশকে পরিচিত করানোই নয়, দেশেও তিনি করছেন সমাজগঠনমূলক নানা কাজ। তিনি হলেন ভ্রমণপিপাসু কাজী আসমা আজমেরী। বাংলাদেশি পাসপোর্টে যিনি ১১ বছরে ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।

২০১২ সাল থেকে নিউজিল্যান্ডে থাকার সুবাদে সুযোগ থাকলেও আজো সেদেশের নাগরিকত্ব নেননি, নিজের দেশকে ভালোবেসে। আসমা আজমেরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি সত্যিই ধন্য যে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে জন্ম নিয়েছি।

নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে দেশকে অসম্মান করার কোনো অর্থই হয় না। এজন্যই দেশের দুর্বল পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশই ভ্রমণ করেছি। প্রমাণ করতে পেরেছি বাংলাদেশিরাও ভ্রমণ করতে পারে।

উৎসাহ জুগিয়েছি ১৮ কোটি মানুষকে। সবুজ পাসপোর্ট দুর্বল নয়, চাইলে আপনিও পারেন ভ্রমণ করতে।’ ভ্রমণে গিয়ে জেল খাটার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এই কাজটি খুব একটা সহজ ছিল না আমার জন্য।

২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম ভিয়েতনামে ২৩ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন জেল খেটেছি। রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং ছিল না বলে আমাকে তারা হেনস্তা করেছে। বাংলাদেশি বলেই আমাকে এমন শাস্তি দেয়া হয়েছিল সেটা প্রথমে বুঝতে পারিনি।’

‘একই বছরের মে মাসের ৩ তারিখ সাইপ্রাসে আবারও ২৭ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন জেলে রাখা হয় আমাকে। তারা গলাধাক্কাই দেয়নি আমাকে, রীতিমতো অপমানও করেছিল। জাতি হিসেবে আমাদের কোনো সম্মান করে না।

সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই ইমিগ্রেশন ধরে নেয় আমরা বুঝি অবৈধভাবে থেকে যাব তাদের দেশে।’ তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করার জন্যই বাংলাদেশি পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমণ করেন জানিয়ে আসমা আজমেরী বলেন,

‘বাংলাদেশিরাও সময় সুযোগ পেলে তাদের ভ্রমণপিপাসু মন উড়ে বেড়ায়, শুধু দেশ নয়, বাংলাদেশের মতো অনেক অনুন্নত দেশের মানুষও ভ্রমণপিপাসু আছে। যারা বিশ্বকে দেখতে চায় কিন্তু ভিসা জটিলতায় তারা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না।’

‘সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করি। মাত্র ৩১ বছরে ১১৫টি দেশ এবং ৯০তম দেশ থেকেই ভিসা জটিলতা, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পরেও বিশ্বভ্রমণ করছি। এখন আমি আমার গল্প পৃথিবীর মানুষকে জানাতে চাই’—বলেন এ ভ্রমণপিয়াসু।

আসমা আজমেরী ফিলিপাইন থেকেই শুরু করেন তার সেই গল্প বলা। ‘ট্রাভেলিং ইজ ফান ওয়ে টু লার্ন’ স্লোগানে বিশ্বের প্রায় ১৮টি দেশে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে গল্পের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, তার ইচ্ছা ছিল মুজিববর্ষে এক লাখ ছেলে-মেয়েকে ভ্রমণে অনুপ্রাণিত করবেন।

আসমা আজমেরী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু তাই নয়, নিউজিল্যান্ডের রেডক্রসের চাকরিটাও হারিয়েছি। গত বছর বাংলাদেশে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করতে এসে আটকে গেছি। তবে দেশে থেকে চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমার প্রিয় শহর খুলনার মানুষকে সহযোগিতা করতে।’

ভ্রমণের শুরুর লড়াই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মেয়ে শাড়ি চুড়ি গহনা পছন্দ করে। অথচ আমি আমার সেই গহনা বিক্রি করে ২০০৯ সালে ভ্রমণ শুরু করি। তারপর চাকরি করে টাকা জমিয়ে দেড় বছরে ছয় মাসে একবার করে কোনো না কোনো দেশ ভ্রমণ করেছি।’

‘বাংলাদেশে এসে করোনায় আটকে যাওয়ায় পরে যখন দেখলাম খুলনার আশপাশের লোকজন কাজ না থাকায় না খেয়ে রয়েছে। তখন ৫০০টি পরিবারকে ৫ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। সেই টাকা জোগাড় করেছি জামা-জুতা ও কসমেটিকস না কিনে। তখন বন্ধুরা উপহাস করেছে। তারা বলতো, বোকা তুমি, পুরোনো জামা-কাপড় পরে থাক’— বলেন আসমা।

এ ধরনের উপহাস সত্ত্বে মানুষের সহযোগিতায় অবিচল ছিলেন তিনি। বলেন, ‘আমার নতুন জামার পরিবর্তে কোনো মানুষের ঘরে এক মুঠো ভাত উঠেছে সেটার ভালোলাগা আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই বুঝবে না।’

ভ্রমণ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি আধুনিক লাইব্রেরি তৈরি করেছেন আসমা। যার নাম দিয়েছেন ‘ইন্সপায়ারিং ইয়ুথ ক্লাব’। এছাড়া ট্রাভেলারদের জন্য মিউজিয়াম, শিশুদের জন্য আর্ট স্কুল, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব ও ইয়ুথ হাব করেছেন। যেখানে খুলনার ছেলেমেয়েরা তাদের গ্রুপ স্টাডি করার সুযোগ পান। টাকার জন্য আসমা আজমেরীর অনেক স্বপ্ন আটকে আছে। কেউ কেউ বই উপহার দিচ্ছেন। কেউবা বুকসেলফ দিয়ে সাহায্য করছেন তাকে।তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, কাজকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। জীবনের প্রতিটি সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। তাহলেই প্রতিটি নারী সফল হবে নিশ্চিত।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *